
প্রস্তাবিত চায়না-মিয়ানমার- বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর একই সংগে বিমসটেক বহুমাত্রিক আর্থ-সামাজিক সহযোগিতাকে বহুলাংশে ত্বরান্বিত ও টেকসই করবে। চায়নার ইউনান প্রদেশের কুনুমিগ হতে মিয়ানমারের মান্দালে পর্যন্ত রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি করলেই প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত ও সময়োপযোগী চায়না-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হয়ে যাবে, যা তামু-মোরেহ পর্যন্ত নির্মাণাধীন বিমসটেক এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে ভারতের ত্রিপুরার মধ্য দিয়ে আমার প্রস্তাবিত ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে হবিগঞ্জের বাল্লা স্থলবন্দরে যুক্ত করা যাবে। এক্সপ্রেসওয়েটি সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ হতে ময়মনসিংহ বিভাগ হয়ে পুন্ড্র সভ্যতা বিধৌত পুন্ড্রভূমি বা পুন্ড্রল্যান্ডের প্রাচীন রাজধানী বগুড়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলা যাবে। একই ভাবে চায়নার কুনুমিগ হতে বুলেট ট্রেন নেটওয়ার্ক নির্মাণ করে মিয়ানমারের মান্দালে পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতে হবে।সেখান থেকে হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্ক স্থাপন করে ইন্ডিয়ার মিজোরামের আইজল পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতে হবে যা বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে ত্রিপুরা হয়ে বাংলাদেশের বাল্লা স্থলবন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতে হবে। সড়কপথের মত একইভাবে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত উত্তরা প্যাসিফিক জোনের বগুড়া জেলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা যাবে। গণভোটর হ্যাঁ সূচক রায় কার্যকর করে জুলাই জাতীয় সনদ-২৫ এর আওতায় দেশের চারটির জায়গায় একটি প্রদেশ গঠন করা ত যাবেই। লজিক ইজ ক্লিয়ার। এখানে সংশয়ের কোন অবকাশ নেই। আর নয় কোন জেলার নামে কোন বিভাগ গঠন, বিদ্যমান রাজশাহী বিভাগ, রংপুর বিভাগ ও ম্যাপে অংকিত ময়মনসিংহ বিভাগসমূহ একত্রিত করে এর সঙ্গে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহ জেলা সমূহ যুক্ত করে দেশের একমাত্র পুন্ড্রল্যান্ড প্রেসিডেন্সি বিভাগ গঠন সময়ের দাবি যা সিলেট বিভাগের সঙ্গে যুক্ত করে স্বায়ত্তশাসিত উত্তরা প্যাসিফিক জোন গঠন সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় টেকনাফ-তেঁতুলিয়া করিডোর গঠনের চিন্তাভাবনা পরিত্যাগ করে অবশ্যই এর পরিবর্তে গড়ে তোলা হোক বগুড়া জেলার মধ্যে দিয়ে হবিগঞ্জ- রাজশাহী সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক যোগাযোগ। চীনা প্রেসিডেন্ট এর প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবে রূপদান করতে গেলে চায়নার ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমার, ইন্ডিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সমূহ ও বাংলাদেশের প্রস্তাবিত উত্তরা প্যাসিফিক জোন মিলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মত বহুমাত্রিক সহযোগিতা সংস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে অত্র কোর কোরিডোরটি আঞ্চলিক লুপ্তপ্রায় সমৃদ্ধ সভ্যতার পুনরুদ্ধার, বিকাশ ও সামাজিকতার উন্নয়ন, ব্যবসায়িক ট্রানজেকশন ত্বরান্বিত করা এবং মাল্টিমোডাল যোগাযোগ হাব প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য পূরণ নানামুখী উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারে। অভ্যন্তরীণ জাতিগত সহিংসতায় জর্জরিত মিয়ানমারের রাখাইনের মধ্য দিয়ে এ ধরনের কোরিডোর বাস্তবায়নের স্থানীয় আরাকান প্রশাসন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে অনুমতি কখনো দিবে না। আবার ব্রিকসের চেতনা ধারণ করে ইন্ডিয়া এই অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হতে আপত্তি করবে না। মিয়ানমার শুধু বাংলাদেশের উন্নত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অথবা প্রেসিডেন্সি জোনের মাধ্যমে ইন্ডিয়া হয়ে করিডোর সংযোগকে নীতিগতভাবে অনুমোদন দিতে পারে। জাপান ইতিমধ্যে একটি মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের লক্ষ্যে ইন্ডিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সমূহ ও বাংলাদেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে একশো বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। সর্বোপরি ভৌগলিক গুরুত্বকে বিবেচনায় নিয়ে এই প্রস্তাবিত অবাধ ও মুক্ত করিডোরটিকে আইএম-সাইনো প্যাসিফিক অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রস্তাবিত উত্তরা প্যাসিফিক জোনের মানচিত্র।
তিন দেশের হাইওয়েতে যে কারণে বাংলাদেশকেও চায় ভারত|
ভারত, মিয়ানমার আর থাইল্যান্ডের মধ্যে যে ত্রিদেশীয় হাইওয়ে তৈরির কাজ চলছে, তাতে বাংলাদেশকেও সংযুক্ত করার জন্য সক্রিয় চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। দিল্লিতে গত শুক্রবার (১৪ জুলাই) এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা সে রকমই ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ‘বর্ডার কানেক্টিভিটি’ বা সীমান্ত সংযোগ কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, তা নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করতেই দিল্লিতে সেদিন ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল ল্যান্ড পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (ভারতের স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ)। ওই অনুষ্ঠানের অবকাশে সংস্থার চেয়ারম্যান আদিত্য মিশ্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আন্তর্জাতিক ওই হাইওয়ের অংশ হিসেবে সীমান্তবর্তী শহর মণিপুরের মোরেহতে তারা যে ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট (আইসিপি) গড়ে তুলছেন, সেই স্থলবন্দর পরিপূর্ণতা পাবে যদি ওই পথে বাংলাদেশেও পণ্যের আমদানি-রফতানি হতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব প্রভাত কুমারও সেখানে জানান, ওই হাইওয়ের মিয়ানমার অংশে ভারত যে প্রকল্পগুলো সম্পাদন করছে, তার ৫০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ। এই প্রকল্পগুলো হলো, ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ কালেওয়া-ইয়াগয়ি রোডকে আন্তর্জাতিক হাইওয়ের স্তরে উন্নীত করা এবং তামু-কালেওয়া রোডে ৬৯টি ব্রিজ আর সংলগ্ন অ্যাপ্রোচ রোড পুনর্নির্মাণ। এই হাইওয়ের সঙ্গে এখন বাংলাদেশও যুক্ত হলে তা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি অনন্য বাণিজ্যিক সংযোগের কাজ করবে বলেও মন্তব্য করেন ওই সিনিয়র কর্মকর্তা। মণিপুর-মিয়ানমার সীমান্তের মোরেহ থেকে থাইল্যান্ডের মা সট পর্যন্ত ১৩৬০ কিলোমিটার লম্বা এই আন্তর্জাতিক হাইওয়ের প্রথম প্রস্তাবনা করা হয়েছিল ২০০২ সালে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে ভার্চুয়াল সামিটের শেষে প্রেস বিবৃতিতে জানানো হয়, ত্রিদেশীয় হাইওয়েতে যুক্ত হতে চেয়ে বাংলাদেশ ভারতের সমর্থন চেয়েছে। তিন মাস পর নরেন্দ্র মোদি যখন ঢাকা সফর করেন, তখনও দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসে। এরপর থেকে সেই লক্ষ্যে অনেকটাই অগ্রগতি হয়েছে। মাস চারেক আগে ঢাকায় থাই পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনও জানিয়েছিলেন, ত্রিদেশীয় হাইওয়েতে চতুর্থ দেশ হিসেবে তাদের যোগদানে ভারত ও থাইল্যান্ড পুরোপুরি রাজি– শুধু মিয়ানমারই এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান এখনও স্পষ্ট করেনি। দিল্লিতে শীর্ষ সরকারি সূত্রগুলো বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে, মিয়ানমারকে এ ব্যাপারে রাজি করানোর জন্যই ভারত পর্দার আড়ালে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, ভারতও মনে করে ভৌগোলিক, বাণিজ্যিক বা কৌশলগত দিক থেকে এই হাইওয়ে প্রকল্প তখনই পরিপূর্ণতা পাবে যখন এই অঞ্চলের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাংলাদেশকেও তাতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। বাংলাদেশের দিক থেকে এই প্রকল্পে যোগদানে আগ্রহের কারণ মূলত দুটো। সেগুলো হলো–
(ক) আসিয়ানের প্রবেশপথ: এই হাইওয়ে চালু হলে বাংলাদেশের জন্য তা সড়কপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা আসিয়ানের দরজাকে উন্মুক্ত করে দেবে। আপাতত থাইল্যান্ডে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পের অংশীদার তিনটি দেশই চায় শেষ পর্যন্ত এই হাইওয়েকে কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত বিস্তৃত করতে। সেক্ষেত্রে এই হাইওয়ে হয়ে উঠবে আসিয়ান ও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রকৃত সেতুবন্ধ। ঢাকা বা কলকাতা থেকে গাড়ি চালিয়ে শুধু ব্যাংকক নয়, হো চি মিন সিটি পর্যন্ত চলে যাওয়া যাবে।
(খ) ভুটান-নেপালে অ্যাকসেস: বাংলাদেশ চায় এই হাইওয়ে শুধু তাদের দক্ষিণ-পূর্বে নয়, পশ্চিম দিকেও প্রসারিত হোক। অর্থাৎ, এই হাইওয়ে বরাবর একদিকে যেমন মিয়ানমার-থাইল্যান্ডে যাওয়া যাবে, তেমনি উল্টোদিকে যাতে ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটানেও বাংলাদেশের ট্রাক যেতে পারে, ঢাকা সেই বিষয়টির ওপরও বিশেষ জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপালের মধ্যে ইতোমধ্যে যে বিবিআইএন মোটর ভেহিকেল চুক্তি আছে, সেটাও এক্ষেত্রে খুবই সহায়ক হতে পারে।
আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, এর আগে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার এই চার দেশ মিলে যে ‘বিসিআইএম করিডর’ নিয়ে কাজ শুরু করেছিল, তাতে বিশেষ অগ্রগতি না হওয়ায় এখন এই ত্রিদেশীয় হাইওয়েই সেটির উপযুক্ত বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। ভারতের স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের হয়ে যিনি ভারত-মিয়ানমার কানেক্টিভিটি সংক্রান্ত রিপোর্টটি প্রস্তুত করেছেন, সেই অধ্যাপক প্রবীর দে বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, এই ত্রিদেশীয় হাইওয়েকে কিন্তু আঞ্চলিক কনটেক্সটে ‘বিমসটেক হাইওয়ে’ নামেও ডাকা হয়। কারণ এটি বিমসটেক কানেক্টিভিটির মাস্টারপ্ল্যানেও আছে। এখন যেহেতু বাংলাদেশ বিমসটেক জোটের পূর্ণ সদস্য, ফলে এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার শতভাগ এখতিয়ার তাদের আছে।

‘বাংলাদেশও মনে করে বিষয়টি ফলাও করে ঘোষণার কিছু নেই, বিমসটেক সদস্য হিসেবে তারা এমনিতেই এই প্রকল্পে আসতে পারে। আমার ধারণা, ধুমধাম করে এই প্রকল্পে যোগ দিতে গেলে তা চীনকে অযথা বিরক্ত করতে পারে, এই ভাবনা থেকেই বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে একটু সাবধানে এগোতে চাইছে। আর ভারতও সেটা মাথায় রেখেই ধীরে ধীরে পা ফেলছে’, বলছিলেন ড. দে। এখানেও বিশেষজ্ঞরা দুটো সম্ভাব্য রুট ভেবে রেখেছেন। এর একটা হলো, ঢাকা-আগরতলা-শিলচর-ইম্ফল হয়ে মোরেহতে এই হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ। দ্বিতীয়টা হলো, ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে আগরতলা-আইজল হয়ে মিজোরাম-মিয়ানমার সীমান্তের জোখাওথর থেকে মিয়ানমারের চিন স্টেটে টেডিন পর্যন্ত এই হাইওয়ের একটি অতিরিক্ত কানেক্ট তৈরি করা, অর্থাৎ একটি শাখা রুটের মাধ্যমে মূল হাইওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ।
যে পথেই হোক, বাংলাদেশকে যে এই প্রকল্পে চাই-ই চাই, তা নিয়ে আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনও সন্দেহ নেই। শুক্রবার দিল্লির ওই অনুষ্ঠানে এশিয়ান কনফ্লুয়েন্স থিঙ্কট্যাঙ্কের কর্ণধার সব্যসাচী দত্ত যেমন বলছিলেন, ‘এই প্রকল্পে বাংলাদেশ যে যোগ দিতে চেয়েছে সেটা খুবই ইতিবাচক লক্ষণ। এখন বাকি দেশগুলোর দায়িত্ব তাদের সেই আগ্রহকে স্বার্থক পরিণতি দেওয়া। ভারতে ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ইকোনমিক ফান্ডামেন্টালসের অধিকর্তা আফাক হুসেইনও মন্তব্য করেন, ‘এই হাইওয়ে বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে সেটার যে সাপ্লাই চেইন, বাংলাদেশ হবে তার অপরিহার্য অংশ। অন্যভাবে বললে, বাংলাদেশের পণ্য এই পথে না-নিয়ে আসতে পারলে এই মহাসড়কের সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করাই যাবে না।
Source: Banglatribune.com
বার্মা কীভাবে ব্রিটিশ ভারত থেকে আলাদা হলো |
বার্মার ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা মূলত ভারতের বাকি অংশ থেকে প্রদেশটিকে সরিয়ে একটি পৃথক উপনিবেশ হিসাবে পরিচালনা করার পক্ষে ছিল। ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল, ভারতীয় উপমহাদেশের শহরগুলোকে যেন বিষণ্নতা গ্রাস করেছে। সুদূরপ্রসারী এক আইন কার্যকর করার পরেই ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীরা আন্দোলন করছে। "কংগ্রেস বড় মিছিল আর হরতালের মত কর্মসূচি পালন করছে নতুন এই সংবিধানের বিরুদ্ধে"- সেদিন সংবাদপত্রগুলোতে এইরকম কিছু সংবাদই করা হয়েছিলো। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে সমগ্র এশিয়াতে প্রভাব ফেলা এক বড় ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা ভারতীয় নেতাদের দৃষ্টিগোচর হলো না: ভারত থেকে বার্মা প্রদেশ আলাদা হয়ে গিয়েছে। র্মা এই সংবাদকে স্বাগত জানিয়েছিল। এপ্রিলের ১ তারিখকে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিলো এবং আনন্দের সাথে উদযাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বার্মা তখনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনেই ছিল। ব্রিটিশ রাজা সম্রাট পঞ্চম জর্জ ঘোষণা দিয়েছিলেন, "আজ থেকে বার্মা ভারতীয় সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে। রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনামলে বার্মা ব্রিটিশ রাজবংশের সার্বভৌমত্বের অধীনে ছিল এবং তখন থেকেই বার্মা বৈষয়িক সমৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় অনেক এগিয়ে গেছে।
তাঁর ভাষ্যমতে দেশটি ভারত থেকে স্বাধীন হয়েই আরো উন্নতি করতে পারবে। ৫ যুগ ভারতের অংশ হিসেবে থাকার পর বার্মাকে আলাদা করে ফেলা হয়। ১৯২২ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত জর্জ অরওয়েল সেখানে 'ইন্ডিয়ান ইমপেরিয়াল পুলিশের' অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন এবং তাঁর প্রথম উপন্যাস "বার্মিজ ডেইজ"-এর পটভূমি এখানেই ছিল। শ্রমিকরা অবাধে পূর্ব এবং দক্ষিণ ভারত থেকে অল্প জনবসতিপূর্ণ দেশটিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। এর ফলে বার্মিজ ভারতীয়রা প্রশাসন ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ১৯২০এর দশক থেকেই বার্মায় সামাজিক অসন্তোষ বাড়তে থাকে। জাতিগত বার্মিজসহ অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীরা অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছিল কারণ ভারতীয় এবং চাইনিজ অভিবাসীরা তাদের থেকেও আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে ছিল। তাদের সেগুন কাঠের শিল্প থেকে যে অর্থ আয় করা হত সেগুলো চলে যেত ইউরোপীয়দের কাছে। বার্মাকে আলাদা করে ফেলার বিষয়টি প্রথম ১৯১৮ সালে বিবেচনা করা হয়েছিল যখন এডউইন মন্টাগু এবং লর্ড চেমসফোর্ড ভারতে ধীরে ধীরে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান চালু করার জন্য সংবিধানের সংস্কারের আলাপ তুলেছিলেন। কিন্তু তখন সামরিক কারণে বার্মা ভারতের সাথে থাকলেই সুবিধা হয় এই মর্মে আলোচনা বেশিদূর যায়নি। ভারত থেকে বার্মাকে আলাদা করার দাবি জোরালো হয় ১৯২০-এর দশকের শুরু থেকেই। বার্মিজ বিধায়ক মং পো বাই ১৯২২ সালে অনুরোধ করেছিলেন একটি কমিটি গঠন করার জন্য, যারা বার্মার "ভারতীয় সাম্রাজ্য" থেকে আলাদা হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে। তাঁর এই আবেদন বার্মা আইন পরিষদের স্পিকার খারিজ করে দেন যার ভাষ্যমতে, দাবি জানানোর সময় তখনো হয়নি এবং এই দাবি তখনই উত্থাপিত হতে পারে যখন বার্মায় একটি সঠিক সংবিধান প্রবর্তিত হবে। তারপরও ১৯২৪ সালে রাজ্যটির আইন পরিষদে ভারত থেকে আলাদা হওয়ার ব্যাপারে একটি প্রস্তাবনা পাশ করা হয়। প্রস্তাবনাটিতে ভারতীয়দের প্রতি বিদ্বেষমূলক কিছু না লিখে বলা হয়: "এটি একটি প্রস্তাবনা যা জাতীয়তাবাদী দল সতর্কতার সাথে প্রণয়ন করেছে কারণ দলের সদস্য এবং বার্মিজদের মধ্যেও এই প্রশ্নটি কখন এবং কীভাবে করতে হবে তা নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু আমরা সবাই একমত যে একদিন বার্মাকে ভারত থেকে আলাদা করতেই হবে। এমন নয় যে ভারতীয়দের প্রতি আমাদের কোনো খারাপ অনুভূতি আছে বা আমরা ভারতীয়দের প্রতি কৃতজ্ঞ নই। আমরা অতীতে ভারতের কাছ থেকে অনেক সুবিধা পেয়েছি। কিন্তু আমরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখেছি যে বিষয়গুলি এমন দাঁড়িয়েছে যে বার্মার পক্ষে চিরকালের জন্য ভারতের সাথে থাকা যুক্তিযুক্ত নয়। এমন কিছু লোক আছে যারা বিচ্ছিন্নতা প্রশ্নে এতটাই দৃঢ় সংকল্প যে তারা অবিলম্বে ভারত থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চায়। এবং বার্মিজদের মধ্যে এমন ভাগও আছে যারা মনে করেন আলাদা হওয়ার আলাপ ধীরে সুস্থে করা উচিত যতক্ষণ না আমাদের কাছে সংস্কারের ভালো পন্থা আছে। ১৯২৮ সালে ভারতীয় আইন প্রণয়ন কমিশন (যা সাইমন কমিশন নামে পরিচিত ছিল) বার্মা সফরে গেলে বিচ্ছেদের ধারণা আরো জোরালো হতে থাকে। ব্রিটিশ পার্লামান্টের এই সাত সদস্যের কমিটির মধ্যে অন্যতম ছিলেন ক্লিমেন্ট এটলি। তাঁর হাতে বার্মার সরকার গোপনে একটি স্মারকলিপি হস্তান্তর করে যেখানে ব্রিটিশ ভারত থেকে প্রদেশের বিচ্ছিন্নতার জন্য একটি মামলা করে হয়েছিল। স্মারকলিপিতে বলা হয়, "বার্মিজরা ভারতীয়দের থেকে জাতিগত ও ভাষার দিক থেকে আলাদা যেমনটা তারা আলাদা ব্রিটিশদের থেকে।" বার্মার সংকটগুলো আসলে ভারতের সংকট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
বিচ্ছেদের জন্য মামলা করার সময় স্মারকলিপিতে কিছু দৃষ্টিকোণ তুলে ধরা হয়: "ঐতিহাসিকভাবে (১০৪৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যখন আনাওরাতা প্যাগান রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন) ১৯ শতকের আগ পর্যন্ত ভারত ও বার্মার মধ্যে খুব কম বা কোন মিল ছিল না এবং বার্মার লোকেরা ভারতীয়দের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তারা একটি ভিন্ন জাতি থেকে এসেছে এবং তাদের একটি ভিন্ন ইতিহাস, একটি ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ভাষা, একটি ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থা, ভিন্ন আচারব্যবহার, ভিন্ন রীতিনীতি এবং জীবনের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।স্মারকলিপিতে বলা হয়েছিল, "বার্মিজদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছিল। তাদের সাধারণ অনুভূতি এমন ছিল যে, এর দূরবর্তী অবস্থানের জন্য এবং এর ভিন্ন এবং তুলনামূলকভাবে ছোট জনসংখ্যার কারণে প্রদেশটির বিশেষ পরিস্থিতি এবং চাহিদার প্রতি যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়নি। বার্মার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যুক্তি দিয়েছিল যে, ভারতে গণতান্ত্রিক সংস্কার চালু হওয়ার সাথে সাথে বার্মার জনগণের অনুভূতিকেও সম্মান করা দরকার। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছিল, "কোন সচেতন বার্মিজ এই সত্যটিকে উপেক্ষা করতে পারে না যে বার্মার জনসংখ্যা (১৩ মিলিয়ন) ব্রিটিশ ভারতের জনসংখ্যার (২৪৭ মিলিয়ন) একটি ভগ্নাংশ মাত্র। এবং এখানে অবশ্যই বার্মা বিভিন্ন রকমের অসুবিধার সম্মুখীন হয় কারণ অপেক্ষাকৃত এই ছোট দেশটি যার নিজস্ব ঐতিহ্য ও নিজস্ব সামাজিক ব্যবস্থা আছে, সেটি অনেক বড় এবং অধিক জনবহুল এমন একটি দেশের সাথে যুক্ত করা হয়েছে যার সাথে এর কোনো জাতিগত বা সামাজিক বা ধর্মীয় সম্পর্ক নেই। এবং দুটি দেশ পরস্পরের সাথে ৭০০ মাইল সমুদ্র দ্বারা এবং পাহাড় ও জঙ্গলের বিস্তৃত অংশ দ্বারা বিচ্ছিন্ন কিন্তু শুধু রাস্তা এবং রেলপথ দ্বারা দুটি দেশ সংযুক্ত। দেখে মনে হবে যে এই ধরনের ভৌগোলিক অবস্থান কেবল অর্থনৈতিক বা জাতীয় প্রয়োজনীয়তা দ্বারাই ন্যায়সংগত হতে পারে। যে কর্মকর্তারা স্মারকলিপি লিখেছিলেন তাদের কাছে জাতি হিসেবে বার্মা প্রদেশে ভারতের চেয়ে বৈশিষ্ট্য বেশি ছিল। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছিল, "এর জনসংখ্যা ১৩ মিলিয়নের কিছু বেশী কিন্তু এটি একটি সমজাতীয় জনসংখ্যার দেশ। বার্মিজরা (বার্মিজ, ক্যারেন, শান এবং তালাইং) দেশটির মোট জনসংখ্যার ৯১ শতাংশ। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছিল, ভারত থেকে আলাদা হয়ে গেলে অল্প সময়ের জন্য বার্মার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কারণ এটি ভারতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই সময় বার্মা শ্রম এবং কয়লার মত পণ্যগুলির জন্য ভারতের উপর নির্ভরশীল ছিল যেখানে। অন্যদিকে ভারত চাল, ধান, পেট্রোল এবং সেগুন কাঠের জন্য বার্মার উপর নির্ভরশীল ছিল। স্মারকলিপিতে বলা হয়, "এটি বোঝা যায় দুটি দেশের মধ্যে কোন বিবাদ থাকতে পারে না। এবং এটি সবচেয়ে বেশি কাম্য যে যদি বিচ্ছেদ ঘটে তবে তা পরস্পরের সম্মতি এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে হওয়া উচিত। এবং এর পিছনে কোনও ধরনের বিরক্তি বা তিক্ততা থাকা উচিত নয়।
সাইমন কমিশনের কাছে যেই যুক্তিতর্ক পেশ করা হয়েছিলো তাঁর উপর ভিত্তি করে লন্ডনের কর্তৃপক্ষ বার্মাকে ভারত থেকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্রথমে তারা এই ব্যাপারে বার্মা থেকে ভোট নিতে চেয়েছিল এবং ফোটের ফলাফল তাদের বিস্মিত করেছিল। ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিলে দ্য গার্ডিয়ানের করা একটি রিপোর্টে ভোটের ব্যাপারে ভালো তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, "নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বার্মিজ সরকারকে হতাশ করে বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতাকারী দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তাদের এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তাদের বিচ্ছিনতার বিষয়টি ঠিকমতো বুঝতে না পারা। তারা হয়ত ফেডারেশনের অংশীদারিত্বের প্রকৃতিকে ভুল বুঝে থাকতে পারে যা বিচ্ছিন্নতার একমাত্র বিকল্প হতে পারে অথবা এটি সম্পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে একটি সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গিও হতে পারে। যাই হোক না কেন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে বার্মিজরা তাদের নিজেদের ভালো বুঝতে পারছে না এবং তারা বার্মাকে আলাদা করার পাশাপাশি বিস্তৃত সংবিধান রচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বার্মায় বসবাসরত ভারতীয়দের উপর তাৎক্ষণিকভাবে বিচ্ছিন্নতার কোনো প্রভাব পড়েনি। রেঙ্গুনের মতো শহরে বিভিন্ন ভারতীয় সম্প্রদায় ১৯৪১-৪২ সালে জাপানি আক্রমণের আগ পর্যন্ত বিকাশ লাভ করতে থাকে। ১৯৪২ সালে অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল এবং তাদের মধ্যে অনেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ফিরে এসেছিল। কিন্তু ১৯৬২ সালে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল নে উইন তাদের জোরপূর্বক দেশটি থেকে বিতাড়িত করেন।
Source: The business standard Bangla.
Post a Comment